বাজেট হোক শিক্ষাবান্ধব

0

।।এমদাদুল হক সরকার।।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’ শিক্ষা একটি দেশ ও জাতির উন্নয়নের প্রধান সিঁড়ি, যা ছাড়া দেশটির উন্নতি অসম্ভব।

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিটি ক্ষেত্রেই উন্নতির প্রধান হাতিয়ার হল শিক্ষা। প্রাচীন যুগে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল আত্মার উন্নতি সাধন, যার জন্য প্রয়োজন হতো সাধনা, চিন্তা ও আত্মসংযম।

শিক্ষা প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তির মাঝে অন্তর্নিহিত যে গুণাবলী রয়েছে সেগুলোকে পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন দক্ষ ও উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যেসব দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার মাধ্যমেই ব্যক্তির সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং সামষ্টিক চেতনার জাগরণ হয়। এজন্য শিক্ষাকে জাতীয় জাগরণ ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি বলা যায়।
দেশের জনশক্তিকে সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিমেয়। আর এসব গুণ মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, নৈতিকতাভিত্তিক, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয় এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষার জন্য রাখা হয় পর্যাপ্ত বরাদ্দ।

একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জাতীয় আয়ের ২ শতাংশের সামান্য বেশি, অর্থাৎ বাজেটের ১১ শতাংশের সামান্য বেশি।

শুধু তাই নয়, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ মোট বাজেটের তুলনায় দিন দিন কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ খাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ হিসাবে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

বাজেটে বরাদ্দের অনুপাতে শিক্ষা খাত শীর্ষ অবস্থান হারিয়েছে। আফ্রিকার তানজানিয়ায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় মোট বাজেটের ২৬ শতাংশ। আর লেসোথোয় এ বরাদ্দ ২৪ শতাংশ, বুরুন্ডিতে ২২, টোগোয় ১৭ ও উগান্ডায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলংকায় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার শিক্ষায় আলাদাভাবে বরাদ্দ দেয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের সাড়ে ১৭ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে শিক্ষা খাতে।
সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। আর মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, যুগোপযোগী শিক্ষা ইত্যাদি। প্রতি বছরই আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

কিন্তু এ হিসাবের মধ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি লুকিয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষ, এমনকি অনেক শিক্ষিত লোককেও ধোঁকা দিতে পারে। কারণ বাজেটে শিক্ষা খাতের বরাদ্দে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ধর্মীয় ও স্বাস্থ্য খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ফলে ভাগ-বণ্টনের মধ্য দিয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কমে যায়। এছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বেশিরভাগ অর্থ প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, বৃত্তি-উপবৃত্তি ইত্যাদি খাতে ব্যয় হয়। আর প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নমূলক খাতগুলো উপেক্ষিতই থেকে যায়।
মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিক্ষক গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতার চার দশক পর বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। তবে এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন।

আর এসবের জন্য বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্যথায় শিক্ষানীতির সুফল থেকে বঞ্চিত থাকবে জাতি। শিক্ষা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে।

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আর এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকতে হবে। এ বছরের বাজেট হোক শিক্ষাবান্ধব, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে।

এমদাদুল হক সরকার: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

(মুক্তমত পাতায় লেখা লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত যা নিউজ পাবনা ডটকম পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে মিল নাও থাকতে পারে।- বি.স)