উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)

0
ছবিতে প্রাচীন আরবদের জীবন যাত্রার চিত্র ফুটে উঠেছে।

।। এবাদত আলী।।

ইহকাল ও পরকালের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রেরিত রাহমাতাল্লিল আলামিন, সাইয়েদিল মুরসালিন, বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.)কে যিনি সর্বপ্রথম আল্লাহর নবী বলে বিশ্বাস করে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দুনিয়ায় অমরকীর্তি স্থাপন করেছেন, সেই মহা পুণ্যবতী ও চিরস্মরণীয় সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহিয়সী নারীর নাম উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রা.)।

ইসলামের ইতিহাসে হজরত খাদিজা (রা.) এর মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী আর কেউ নেই। তিনি নিজের বিপুল ধন সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছেন ইসলামের জন্য।

তা ছাড়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন বিধর্মীদের হাতে। মহান আল্লাহ পাকের প্রিয় নবী, বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, “বেহেস্তের নারীদের মধ্যে চারজন হবে সর্বশ্রেষ্ঠ। মোজাহামের কন্যা আছিয়া, ইমরানের কন্যা মরিয়ম, খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজা এবং মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা।”

হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ছিলেন তৎকালিন আরবের সম্ভ্রান্ত ও শ্রেষ্ঠ কুরাইশ বংশের ধনাঢ্য ব্যক্তি খুয়াইলিদের কন্যা। খুয়াইলিদ খ্রিষ্টান পরিবারে জন্মলাভ করায় খ্রিষ্টান ধর্মের রীতিনীতি মেনে চলতেন ফলে আরবের অধিকাংশ লোক যখন মুর্তি পুজায় লিপ্ত ছিলো তখন তার পরিবার মুর্তি পুজার বিরোধি ছিলেন।

হজরত খাদিজা (রা.) বাল্যকাল হতেই অত্যন্ত নির্মল চরিত্রের অধিকারি হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন। তাঁর মুখে কেউ কখনো মিথ্যা কথা, কটু কথা শুনেনি। তিনি কখনো পাড়া-প্রতিবেশি ছেলে-মেয়েদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হতেননা।

সেজন্য সকলেই তাঁকে অত্যন্ত ভালো বাসতেন। পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন সকলেই বলতেন খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজা ভবিষ্যতে একজন মহিয়সী নারী রূপে পরিচিত হবেন।

বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)কে আরবের লোকেরা যেমন বাল্যকাল হতেই অত্যন্ত ভালো বাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন। তেমনি হজরত খাদিজাকেও মক্কার সর্বস্তরের লোক ভালো বাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) কে যেমন বাল্যকালে মক্কার লোকেরা “আল-আমিন” অর্থাৎ বিশ্বাসি উপাধিতে ভুষিত করেছিলেন, ঠিক তেমনি মক্কার লোকেরা হজরত খাদিজা (রা.)কে “তাহিরা” অর্থাৎ পবিত্র উপাধিতে ভুষিত করেছিলেন। এমনকি অনেকেই তাঁকে খাদিজা না বলে তাহিরা বলে ডাকতেন।

হজরত খাদিজা (রা.) এর বয়স যখন ১৫ বছর তখন তাঁর পিতা মক্কার এক উচ্চ বংশীয় শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবক আবু হাওলা ইবনে জিয়ারা তামিমি এর সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের কয়েক বছর পর আবু হাওলা মৃত্যুবরণ করেন। হজররত খাদিজা (রা.) দু পুত্র সন্তানসহ পিতার গৃহে চলে আসেন।

পরে আরেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত যুবক আতিক ইবনে আয়েদ মাখজুমির সঙ্গে তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের ১বছর পর তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মলাভ করে, এবং এর পরপরই আতিক মৃত্যুবরণ করেন।

হজরত খাদিজার গর্ভে যে ৩ জন সন্তান জন্মলাভ করেছিলেন তারা সকলেই বাল্যকালে মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে বয়োবৃদ্ধ পিতা খুয়াইলিদ হজরত খাদিজা (রা.)কে একমাত্র ওয়ারিশ রেখে পরলোকগমণ করেন।

অপরদিকে তাঁর পূর্বতন স্বামীগনের কোন উত্তরাধিকার না থাকায় তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হন।

ঐতিহাসিকগণ হজরত খাদিজা (রা.) এর সম্পদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। তাঁর সত্তর হাজার উট ছিলো, যেগুলোর মাধ্যমে ব্যবসার রসদপত্র দেশের অভ্যন্তরে ও অন্যান্যদেশের বিভিন্ন স্থানে মালামাল বহন করতো। তাঁর বিশালকায় একটি গুদাম ঘর ছিলো, যে ঘরের উপরে সবুজ রেশমি কাপড়ের তৈরি সাইনবোর্ড ঝুলানো ছিলো। সে ঘরটি ছিলো বিভিন্ন ধরনের মালামাল সম্পদে ভরপুর। তাঁর অনেকগুলো দাস-দাসি বা কর্মচারি ছিলো যাঁরা তার ব্যবসার রসদপত্র বিভিন্ন দেশে আমদানি বা রপ্তানি করতো।

বিশ্ব নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর সাথে পরিণয়সুত্রে আবদ্ধ হওয়ার পুর্বে হজরত খাদিজা (রা.) এব আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন। সেই সপ্নের কথা তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা বিন নওফেলের কাছে ব্যক্ত করলে তিনি সপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন, শেষ যুগে এক রাসুলের আবির্ভাব ঘটবে এবং তার সাথে তোমার বিয়ে হবে।

হজরত মোহাম্মদ (সা.)যখন ব্যবসায়িক কাজে মনোনিবেশ করেন তখন হজরত খাদিজা (রা.) এর সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। হজরত খাদিজা (রা.) বদ্ধ পরিকর ছিলেন যে, তিনি আর কাউকে বিয়ে করবেননা। বাকি জীবনটা এভাবেই কাটাবেন।

কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মেহেরবাণীতে তিনি হজরত মোহাম্দ (সা.) এর সাথে পরিণয়সুত্রে আবদ্ধ হন। হজরত খাদিজা (রা.) এর বিপুল ধন-সম্পদ হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর পদতলে লুটিপুটি খেলেও সেদিকে তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

তিনি অবসর পেলেই চলে যেতেন নির্জন হেরা পর্বতের গুহায়। সেখানে বসে ধ্যানে মগ্ন হতেন। দু-চারখানা রুটি, কিছু খেজুর ও পানীয় নিয়ে যেতেন। সেগুলো ফুরিয়ে গেলে আবার গৃহে ফিরে আসতেন এবং খাদ্য ও পানীয় নিয়ে যেতেন।

মাঝে মাঝে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ফিরতে দেরি হলে হজরত খাদিজা (রা.) খাদ্য ও পানীয় নিয়ে তাকে দিয়ে আসতেন। কিন্তু কোন প্রশ্ন করতেননা।

হজরত মোহাম্মদ (সা.) চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করলে ইসলামের দাওয়াত পৌছাতে শুরু করেন। হজরত খাদিজা (রা.) সর্বপ্রথম আল্লাহর নবী বলে বিশ্বাস করে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

ইসলাম প্রচারের ফলে আরবের লোকদের মধ্যে অধিকাংশই এমনকি নিকট আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি হজরত মোহাম্দ (সা.) এর সঙ্গে ভীষণ শত্রুতা শুরু করলো এবং তাঁর প্রাণ নাশের জন্য নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে তখন হজরত খাদিজা (রা.) নিজের যাবতীয় ধন-সম্পদ, জীবন-মন সব কিছুই স্বামীর সাহায্যে উৎসর্গ করে স্বামী সেবাকেই তিনি জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য বলে মেনে নেন।

রাসুলে পাক (সা.) এর কঠিন বিপদের দিনে তিনি যে শুধু স্বামীকে আর্থিক সাহায্য করে ক্ষান্ত ছিলেন তা নয় বরং সর্বদা ছায়ার মত তাঁর সুখ-দুঃখের সাথি হয়ে সত্য ধর্ম প্রচারে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন।

কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে রাসুলে পাক (সা.)কে যখন ঘর-বাড়ি পরিত্যাগ করে দীর্ঘ তিন বছর পর্বত গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে বন্দি জীবন যাপন করতে হয়েছিলো সেই দীর্ঘ সময় তাঁদের উপার্জনের পথ বন্ধ থাকায় এবং বাইরে থেকে কোনরূপ খাদ্য-পানীয় আমদানি করার কোন উপায় ছিলনা তখন সেই চরম সঙ্কটের সময়ও হজরত খাদিজা (রা.)স্বেচ্ছায় সেসকল দু:খ-কষ্ট বরণ করে স্বামী সেবায় নিবেদিত ছিলেন।

হজরত খাদিজার গর্ভে চার কন্যা ও দু-পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। কন্যাদের নাম যথাক্রমে, জয়নাব, রোকাইয়া, উম্মে কুলছুম ও ফাতেমা (রা.)।

পুত্রদের নাম কাসেম ও আব্দুল্লাহ। নবুয়তে প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারি এবং তাঁর সাথে প্রথম সালাত আদায়কারি, ইসলামের ঘোর দুর্দিনে পরামর্শদাত্রী ও সাহায্যকারি উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ রমজান ৬৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

তখন জানাজা নামাজের বিধান চালু না থাকায় বিনা জানাজায় মক্কার কবরস্থান জান্নাতুল মোয়াল্লায় তাঁকে দাফন করা হয়। রাসুল (সা.) নিজেই তাঁর লাশ কবরে নামান এবং দোয়া করেন।

 

(লেখক: সাংবাদি ও কলামিস্ট)।