ইছামতি নদী বাঁচাতে পাবনাবাসীর আকুতি

0
ছবি- সোহেল রহমানের পোস্ট থেকে নেওয়া।

আগামি ১৪ জুলাই পাবনা আসছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর পাবনা সফর নিয়ে পাবনাবাসীর রয়েছে অনেক চাওয়া- পাওয়া। ফেসবুকে এই চাওয়া- পাওয়ার পরিমান অনেক। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পরছে পাবনা শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীতে পানি প্রবাহ নিয়ে।

পাবনাবাসীর প্রাণের দাবী ইছামতি নদী দখলকারীদের উচ্ছেদ করে এই নদীতে পানি প্রবাহিত করতে হবে।

পাবনার নাগরিকদের কথা বলার সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচিত ‘সিটিজেন ভয়েস পাবনা’ পেজে ইছামতি নদী বাঁচাতে আবেগঘন একটি আকুতি জানিয়েছেন সোহেল রহমান নামে একজন লেখক।

সোহেল রহমান এর ইছামতি নদী নিয়ে পরিবেশ বান্ধব লেখাটি ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। অনেকেই লেখাটির প্রশংসা করে মন্তব্যও লিখেছেন।

সোহেল রহমান বর্তমানে তার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্রিজ এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইছামতি নদী বাঁচানোর আকুতি নিয়ে সোহেল রহমান এর ‘পাবনা শহরের হার্ট অ্যাটাক’ শিরোনামের সেই লেখাটি নিউজ পাবনার পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

পাবনা শহরের হার্ট অ্যাটাক!!!

ছোটবেলায় আমার বাবা ব্যাবসার কারনে বেশিরভাগ সময় চট্রগ্রাম থাকতেন আর আমরা সবাই পাবনা থাকতাম। বাবা বছরে তিন চার বার পাবনা আসতেন আর ওই সময়টা আমার জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন যেসব বায়না আম্মাকে বলে পুরণ হতোনা, সেগুলো আব্বাকে বললে পুরণ হওয়ার চান্স ছিল প্রায় নব্বই শতাংশ। দেখা যাচ্ছে কোন কিছু আমার জন্য অতি প্রয়োজনীয়, কিন্তু আম্মার কাছে সেটা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু আব্বা ব্যাপারটা আমলে নিয়ে নিত। আমিও সেই চান্সই নিতাম।

এই মুহূর্তে ঠিক সে রকমই একধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখী আমরা পাবনাবাসি।

আগামী ১৪ই জুলাই রুপপুরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসবেন দ্বিতীয় পারমানবিক চুল্লির ফার্স্ট কংক্রিট পোরিং এর উদ্বোধনের জন্য। ভাবতেই ভালোলাগে বাংলাদেশের মত জায়গায় একটা পারমানবিক স্থাপনা হচ্ছে, যেটা কিনা আমারই জন্মভূমি পাবনাতে, ব্যাপারটা খুবই গর্বের। স্থাপনাটা শেষ হলে এখান থেকে আমরা ২.৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবো যেটা এই সরকারের অভাবনীয় ও যুগোপযোগী উদ্যেগ। এই স্থাপনার সাথে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ভাবে জড়িত। এবং সেকারনেই আমরা না চাইলেও পাবনা এমনিতেই আন্তর্জাতিক নগরীতে রুপান্তরিত হতে যাচ্ছে। এখানে অনেক বিদেশীর অবস্থান এবং আমরা পাবনাবাসী সবাই জানি ছুটির দিনে প্রচুর বিদেশীর সমাগম হয় যেটা খোদ রাজধানীতেও আজকাল বিরল।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, একটা দলের প্রধান নেতা নির্বাচনের আগে যখন কোন নির্বাচনী এলাকায় যান, খুবই স্বাভাবিক সেই এলাকার মানুষ যেন সেই নির্বাচনে তার দলকে সমর্থন করে সেই জন্য তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। সুতরাং এমন একটা সুযোগ আমাদের পাবনাবাসীর কাছে আগে কখনও আসছে কিনা জানা নাই আবার ভবিষ্যতে কবে আসবে তাও জানা নাই। আর বুদ্ধিমান তারাই, যারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। আর এসব কারনেই ছোটবেলার কথাগুলো মনে পড়ে গেল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা চাইবোটা কি?আমরা কি পেতে পারি? কি পেলে আমরা সবচেয়ে লাভবান হবো আমরা আসলে এই মুহূর্তে? আমার লেখাটার শিরোনাম “শহরের হার্ট অ্যাটাক”ই বা কেন?

একজন সাধারন নাগরীক হিসাবে আমার বক্তব্য এবং চাওয়া আমি এই লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করলাম। ভুল্ভ্রান্তির জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

একটা মানুষের দেহের আর পৃথিবীর আন্তচলন প্রক্রিয়া একই রকম। কারন এই পৃথিবীর উপাদান দিয়েই আল্লাহ পাক আমাদের তৈরি করেছেন। মানুষের শরীরের কোন অংশ দিয়ে যদি ঠিকঠাক মত রক্ত চলাচল করতে না পারে, তাহলে ওই অংশ আস্তে আস্তে বিকল হয়ে যায়, আর সেটা যদি হার্টে হয়, তাহলে তো কথাই নাই।

কোন সন্দেহ নাই পাবনা শহর এই জেলার হার্ট। আর এই হার্টের ধমনী আছে। সেটা হচ্ছে শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদী। আর আমরা ইচ্ছা করে আল্লাহ পাকের প্রদত্ত সেই রহমতের ধমনী বন্ধ করে রেখেছি দীর্ঘ দিন ধরে। খুব খেয়াল করে হিসাব করে দেখেন পৃথিবীতে কয়টা শহরের মধ্যে দিয়ে নদী গেছে! খুবই কম, এবং যে শহরগুলোর ভেতর দিয়ে নদী গেছে সেগুলো বিখ্যাত, যদি তারা সেটাকে আমাদের মত ব্লক করে না রাখে (উদাহরন হিসাবে কিছু ছবি যুক্ত করলাম)। যেখানে একটা শহরে নদী না থাকলে বিলিয়ন ডলার খরচ করে লেক বানানো হয়, সেখানে আমাদের শহর এমন একটা শহর যেটার মাঝখান দিয়ে নদী বয়ে গেছে। নদী আল্লাহ পাকের পবিত্র রহমত। আর আমরা নিজেরা যেমন বিভিন্ন অসচেতনতার কারনে বোকার মত হার্টে ব্লক বানিয়ে ফেলি, ঠিক তেমন করে পাগলের মত নদী ব্লক করে ফেলেছি। এখন বুঝি পাবনায় পানি জমে কেন? আরে এটা তো পানি না, রক্ত। হার্ট ব্লক হলে যেমন শরীরের সবকিছু আস্তে আস্তে অসাড় হয়ে পড়ে, হিসাব করে দেখেন পাবনারও তাই হচ্ছে।

একটা নদী ব্লক হয়ে যাওয়াতে আমাদের স্বাভাবিক চোখে হয়ত এর ক্ষতিকর দিকগুলো চোখে পড়েনা। কিন্তু ভালোকরে চিন্তা করলে দেখবেন, এই কারনে আমাদের শহরে পানি জমে, পানি জমলে রাস্তা টিকেনা, মশা হয়, পানি দুষিত হয়ে রোগবালাই ছড়ায়, আর এসবকিছুর জন্য মানুষের মন মেজাজ খিটখিটে থাকে, আর একারনে অনেক খারাপ ব্যাপার গুলো ঘটে। এটা চলতে থাকলে ধীরে ধীরে আরও খারাপ পরিনতির দিকে যায়। ঠিক মানুষের হার্টের মত। মানুষের হার্ট যেমন ধীরে ধীরে ব্লক হতে হতে একদিন সে ধুপ করে পড়ে যায় বুক ধরে, আপনি চিন্তা করে দেখেন আমাদের শহরের অবস্থা বুক ধরে পড়ে যাওয়ার মতই। শুধু মাত্র একটা নদী বন্ধ হয়ে থাকার কারনে আরও কত কিছু হচ্ছে।

অথচ এই নদী যদি আমরা সংস্কার করে একে চলমান করতে পারি, এর সাথে ড্রেনেজ ব্যাবস্থার যথার্থ সংযোগ স্থাপন করতে পারি, আমাদের শহর প্রান ফিরে পাবে। আর নদীর দুই পাশ যদি নিচের গুগল থেকে নামানো ছবিগুলোর মত হয় বা আরো সুন্দর হয়, একবার ভাবেন আমাদের শহরে এর কি কি প্রভাব পরতে পারে। এটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল, রেস্তোরা, বিনোদন কেন্দ্র, শরীর চর্চা কেন্দ্র,বাচ্চাদের খোলা জায়গা, মানুষের যাতায়াত, বিকল্প সস্তা পরিবহন ব্যাবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি এমন অনেক কিছু, যদি থাকে সঠিক পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন। উন্নত বহির্বিশ্বে যা আছে একটা ছোট নদীকে কেন্দ্র করে, আমাদের এখানে তা হওয়া আমার কাছে তো মনে হয় অসম্ভবের কিছু নাই।

সুতরাং, হার্ট সার্জারি করার সুযোগ সামনে। খুব ছোট চাওয়া। আমরা সবাই জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দরদী, দয়ালু, মমতাময়ী একজন মানুষ, আমাদের উপর মায়া করে হয়ত ইছামতি নদীর শুধু সার্জারি না, সুন্দর রিংও পরিয়ে দিতে পারেন যদি আমরা ঠিক মত চাইতে পারি (এখানে রিং বলতে বোঝানো হচ্ছে শহরের নদীর অংশের দুইপাশের সৌন্দর্য)।

পরিশেষে, যে কথাগুলো না বললেই নয়, আমি হয়ত ছোট মুখে অনেক বড় বড় কথা বললাম, ভুল কিছু হলে আবারো ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। একজন সাধারন নাগরীক এবং পাবনার সন্তান হিসাবে এগুলো আমার মনের কথা এবং কথাগুলো বলা কর্তব্য বলেই মনে করি। আর স্যালেলাইট টেকনোলোজির যুগে যদি না বলতে পারি সেটাকেই বরং দৈনতা বলব। সরকার অবশ্যই চায় আমরা তাদের কে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করি।

আমি জানি আমাদের মাননীয় এমপি প্রিন্স ভাই যথেষ্ট যোগ্য, স্মার্ট, সৎ, জ্ঞানী এবং ভালোমানুষ। ওনার লিস্টে অবশ্যই ইছামতি নদীর ব্যাপারটা আছে বা থাকবে কারন এটা একটা অপরিহার্য ব্যাপার এবং উনি ওনার দূরদর্শী উপস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাপারটার গুরুত্ব তুলে ধরবেন ইনশাআল্লাহ।

আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই যেন পাবনা বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর শহর্‌ হয়।

আর স্বপ্ন দেখতে তো পয়সা লাগছেনা!